শ্রাবন্তী রান্নাঘরের জানালা বন্ধ করে এসে অনীশের কোলে মাথা দিয়ে শুলো। ৫টাও বাজেনি এখনো কিন্তু আকাশ কালো করে চলছে কালবৈশাখীর দাপট, ঝিরঝিরে বৃষ্টিও নেমেছে মনে হয় - সোঁদা গন্ধ ভেসে আসছে। নিজের অজান্তেই অনীশ শ্রাবন্তীর চুলে বিনুনি কেটে চলেছে।
"আচ্ছা
এই যে খুব অন্তরঙ্গ
মুহূর্তে যখন তুই আমাকে
আই লাভ ইউ বলিস
আর আমিও প্রত্যুত্তর দিই,
তোর কি মনে হয়
না এটা শুধু কথার
কথা, আসলে আমাদের মধ্যে
যোজন প্রমান দূরত্ব ?" শ্রাবন্তী অন্যমনস্ক ভাবে প্রশ্ন করে।
"সে
আবার কি!" অনীশ বলে. "আই
লাভ ইউ মানে আই
লাভ ইউ, আর কি
হবে?"
"হুম"
শ্রাবন্তী বলে একটু থেমে,
"ও কে, থিঙ্ক অফ
এ ট্রি" ।
"মানে?"
অনীশ অবাক হয়।
"মনে
মনে একটা গাছের কথা
ভাব" ।
"যে
কোনো গাছ?"
"হ্যাঁ
" শ্রাবন্তী হেসে বলে। অনীশ
কিছুক্ষন চুপ করে চিন্তা
করে। "তো কোন গাছ
মাথায় আসছে?"
"উমম...
একটা আকাশছোঁয়া লম্বা গাছ, ঘন জঙ্গলের
মধ্যে - হয়তো পাইন বা
ইউকিলিপটাস।"
"এই
তো, এটাই ব্যাপার। জানিস
আমার মনে কি এসেছিলো?
অপরাজিতা ফুলের গাছ। আমার লতা
গাছ শহুরে বাড়ির ছাদে বা হাইওয়ে
এর পাশে গজানো আর
তোর মহীরুহ মাথা উঁচিয়ে ঘন
জঙ্গলে। "
"তাতে
কি ! দুটোই তো গাছ ।
"
"হ্যাঁ,
সেটা ওই নাম মাত্র।
আমরা একই জিনিস নিয়ে
ভাবছি , অথচ আমাদের এসোসিয়েশনে
কি বিস্তর পার্থক্য - আমাদের অভিজ্ঞতা আর জীবনবোধই আলাদা
করে দেয়। "
"হুম
, তা ঠিক " , অনীশ বলে। "এখন
তুই বলার পর আমিও
পার্থক্য তা বেশ বুঝতে
পারছি। অবাক কথা আমি
ঘুনাক্ষরেও কোনো শহুরে গাছের
কথা ভাবিনি , সোজা চলে গেছি
জঙ্গলে। তার অন্য একটা
সৌন্দৰ্য , অন্য দর্শন। শহরের
চেয়ে ওই আমাকে বেশি
টানে। "
"এক্সাক্টলি।
তাহলেই এবার বুঝে নে
, গাছের মতো একটা আপাত
সাধারণ জিনিসে যখন এতো তফাৎ
, তখন ইন্ট্যাঞ্জিবল ইমোশনস এর ক্ষেত্রে কি
হবে !"
"লাইক
লাভ ?"
"ইয়েস
স্যার " শ্রাবন্তী ক্লাশে উত্তর দেবার ভঙ্গিমায় সোজা হাত তুলে
বলে।
অনীশের
কপালে ভাঁজ , এই আলোচনা যে
এতো কঠিন হবে সে
ভাবেনি। "সো তুই কি
ভেবে আই লাভ ইউ
বলিস?"
"মনের
সংযোগ, আত্মার মিলন" শ্রাবন্তী বলে চলে , "আমরা
ওই মেটে ইঁদুরের মতো
একে ওপরের হৃদয়ের গভীরে গর্ত খুঁড়ে চলেছি,
সারে পৌঁছবো বলে। অদ্ভুত সে
যাত্রা - মিস্টেরিয়াস, ভালনারাবেল, এডভেঞ্চারাস...।"
"ওয়াও!
দ্যাটস কোয়াইট সামথিং"
"আর
তুই? তোর কাছে আই
লাভ ইউ মানে ?"
অনীশ
আবার একটু ভাবে। "আমার
কাছে শুধুই অনাবিল আনন্দ।" অনীশ বলে, "ভালোবাসা
হলো তোকে জড়িয়ে ধরা,
পার্কার বেঞ্চিতে বসে চুমু খাওয়া,
তোর সাথে খোলা আকাশের
নিচে বসে তারা গোনা,
তোকে কবিতা শোনানো বা তোর কানে
জবা ফুলটি গুঁজে দেওয়া - সহজ চাওয়া-পাওয়া
,তাৎক্ষণিক ।"
শ্রাবন্তী
বাঁকা হাসি হেসে বললো
, "মিষ্টি !"
"কিন্তু
তোর ভার্সানটা তো আমার চেয়ে
ঢের গভীর। "
"ধ্যাৎ,
এটা কি কম্পিটিশান নাকি!"
শ্রাবন্তী এবার খিলখিলিয়ে হেসে
উঠলো। "এখানে কেউ ফার্স্ট সেকেন্ড
হচ্ছে না বাবু। আমি
তো বলি, কোনো ভালোবাসাই
ফেলনা নয়। চেষ্টা এখন
পরস্পরের ভালোবাসার জগৎটা কত ভালো ভাবে
চেনা যায়। "
"সত্যি
কি কখনো অন্যকে এতটা
জানতে পারবো? "
"হয়তো
না। ভালোবাসাটা সত্যি হলে জানার চেষ্টাটা
তো থেকেই যাবে, তাই না?" শ্রাবন্তী
আলতো স্বরে বলে।
"হুম,
তো এখন আমাদের এই
বিপরীতগামী জীবন-সংজ্ঞা গুলো
কে মেলাবো কি করে?" অনীশ
ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে।
"তবে কি দূরত্ব কমবে
না? এই পুরো আলোচনার
সেটাই কি মুখ্য উদ্দেশ্য
নয়? "
শ্রাবন্তীর
চোখে অদ্ভুত দ্যুতি, সে অনীশের দিকে
তাকায়।
"কি?"
অনীশ বোকার মতো জিজ্ঞেস করে।
"মনে
হচ্ছে আমরা ঠিক দিকেই
এগোচ্ছি বুঝলেন বাবুমশাই" শ্রাবন্তীর মুখে মোহক হাসি।
"অল উই নিড টু
ডু ইজ কিপ টকিং।
"
বাইরে
এখনো ঝোড়ো হাওয়া আর
বৃষ্টি। শ্রাবন্তী রান্না ঘরে গিয়ে দু-কাপ চা নিয়ে
আসে।
আজ সেইরকম ভালো লাগা একটা
বিকেল।
No comments:
Post a Comment